শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা কি ও শিক্ষা পক্রিয়া উপাদানগুলি পারস্পরিক আলোচনা কর।
শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা(Child–Centric Education )
অর্থ (Meaning of Child–Centric Education):
শিক্ষার বিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রাচীনকালে শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল শিক্ষক–কেন্দ্রিক (Teacher–Centric)। অর্থাৎ শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন শিক্ষক। কিন্তু আধুনিক কালে শিক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে “শিক্ষার্থী” বা “শিশু”।
শিক্ষা আজ আর শিক্ষকনির্ভর নয়, বরং শিক্ষার্থীর প্রয়োজন, আগ্রহ, সামর্থ্য ও প্রবণতা অনুসারে শিক্ষা পরিচালিত হয়। তাই এই শিক্ষাকে বলা হয় শিশু–কেন্দ্রিক শিক্ষা (Child–Centric Education)। এ শিক্ষা শিশুর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক বিকাশে সহায়তা করে।
শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার সংজ্ঞা (Definition):
শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার ইংরেজি শব্দ: Paido–Centric Education
“Paido” শব্দটি গ্রিক ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ “শিশু”।
এই শিক্ষার মূলে রয়েছে শিশুর স্বতঃস্ফূর্ততা (Spontaneity), অভিজ্ঞতা (Experience), ও স্বাধীনতা (Freedom)।
অর্থাৎ, শিক্ষা এমনভাবে হতে হবে যাতে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ও আনন্দ বজায় থাকে। শিক্ষা হবে শিশুর চাহিদা ও আগ্রহ–নির্ভর, শিক্ষকের চাপ–নির্ভর নয়।
শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার ধারণা (Concept of Child–Centric Education):
শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার ধারণা সর্বপ্রথম দেন ফরাসি শিক্ষাদার্শনিক জ্যাঁ জ্যাক রুশো (Jean Jacques Rousseau)।
তিনি বলেন —
“Education should be according to nature.”
অর্থাৎ, শিক্ষাকে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিশুর প্রাকৃতিক প্রবণতা অনুযায়ী পরিচালনা করতে হবে।
রুশোর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Emile’–এ তিনি লিখেছেন —
“Everything is good as it comes from the hands of the Author of Nature, but everything degenerates in the hands of man.”
অর্থাৎ প্রকৃতি যা সৃষ্টি করেছে তা ভাল, কিন্তু মানুষ তা বিকৃত করে ফেলে।
এই চিন্তাধারাই প্রকৃতিনির্ভর ও শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার ভিত্তি।
শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার ঐতিহাসিক বিকাশ (Historical Development):
(i) প্রাচীন যুগে:
কুইন্টিলিয়ান (Quintilian):
প্রাচীন রোমান শিক্ষাবিদ কুইন্টিলিয়ান শিশুদের প্রতি স্নেহ, সহানুভূতি ও চাপমুক্ত শিক্ষা দেওয়ার পক্ষে মত দেন।
তিনি শাস্তি ও নির্যাতনের বিরোধিতা করেন।
শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের প্রয়োজনীয়তা তিনি প্রথম উপলব্ধি করেন।
(ii) পঞ্চদশ শতাব্দীতে:
প্লেটো (Plato):
তিনি ‘Academy’ নামে বিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং বলেন —
শিশুকে শিক্ষা দিতে হবে খেলার ছলে, গল্পের মাধ্যমে ও অনুকরণের দ্বারা।
তিনি শিক্ষায় স্বাধীনতার গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
(iii) ষোড়শ শতাব্দীতে:
কমেনিয়াস (Comenius):
তিনি বলেন শিক্ষা হবে শিশুর অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে।
বিষয়বস্তু হবে বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাকে বলা হয় “মনোবিজ্ঞাননির্ভর শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার জনক।”
(iv) সপ্তদশ শতাব্দীতে:
জন লক (John Locke):
তিনি শিশুর অভিজ্ঞতা, চাহিদা ও সামর্থ্য বিবেচনা করে শিক্ষা প্রদানের পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, “শিক্ষা কোনো বোঝা নয়, বরং আনন্দদায়ক প্রক্রিয়া।”
(v) অষ্টাদশ শতাব্দীতে:
রুশো (Rousseau):
তিনি বলেন —
“A child is a book which the teacher has to learn from page to page.”
অর্থাৎ শিক্ষক শিশুর কাছ থেকে শেখবেন, শিশুর প্রতিটি অধ্যায় বুঝে তাকে শিক্ষা দিতে হবে।
তিনি শিশুর স্বাধীনতা, স্বতঃস্ফূর্ততা ও প্রকৃতিনির্ভর বিকাশের উপর গুরুত্ব দেন।
(vi) উনবিংশ শতাব্দীতে:
জন ডিউই (John Dewey):
আমেরিকার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও প্রয়োগবাদী দার্শনিক।
তিনি বলেন —
“Education is the reconstruction of experience.”
অর্থাৎ শিক্ষা হলো অভিজ্ঞতার পুনর্গঠন।
তিনি শিশু–কেন্দ্রিক, কার্যভিত্তিক ও অভিজ্ঞতানির্ভর শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন করেন।
5. শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষার বৈশিষ্ট্য (Characteristics):
a. মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি (Psychology–Centred):
শিক্ষা হবে শিশুর মনস্তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে।
তার আগ্রহ, প্রবণতা, সামর্থ্য ও বিকাশের স্তর বিবেচনা করে শিক্ষা দিতে হবে।
b. সক্রিয়তার নীতি (Activity Principle):
শিশু “করে শেখে” — Learning by Doing।
সে হাতে–কলমে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করে।
c. ব্যক্তি বৈষম্যের নীতি (Principle of Individual Difference):
প্রত্যেক শিশুর মানসিক ও শারীরিক ক্ষমতা আলাদা।
তাই শিক্ষার পদ্ধতি ও গতি তার ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে।
d. স্বাধীনতার নীতি (Principle of Freedom):
শিশুর চিন্তা, কথা ও কাজের স্বাধীনতা থাকা জরুরি।
তাকে বাধ্য করা যাবে না — বরং শেখার সুযোগ দিতে হবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন